এই অধ্যায়ে আমরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার (১৭৬৫-১৮৫৭ খ্রিঃ) [ Growth of British Empire in India (1765-1857 A.D.) ] নিয়ে আলোচনা করব।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের ফলে বাংলার মাটিতে ইংরেজ শক্তির প্রথম ভিত্তি রচিত হয় এবং তারপর ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের এক বিশাল অঞ্চলে ইংরেজ সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। বলা বাহুল্য বাংলা, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সহজে হয়নি। উত্তর ভারতে প্রবল পরাক্রান্ত মারাঠা ও শিখ, দাক্ষিণাত্যে মহীশূর রাজ্য এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ইংরেঞ্জ সেনাপতিরা ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
মহীশূর রাজ্যের উত্থান (Rise of Mysore and the Anglo-Mysore Relations ) :
হায়দার আলি :
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হায়দার আলির নেতৃত্বে মহীশূর রাজ্যের উত্থান সমকালীন ভারত- ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ড. কালীকিঙ্কর দত্তের মতে, “অষ্টাদশ শতকের ভারতের ইতিহাস হল ভাগ্যান্বেষী, দুঃসাহসিক ব্যক্তিদের ক্ষমতালাভের কাহিনী” । মহীশূরের হায়দার আলি ছিলেন এইসব দুঃসাহসিক ভাগ্যান্বেষীদের অন্যতম। এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কেবল নিজ কর্মদক্ষতা ও প্রতিভাবলে তিনি মহীশূর রাজ্যের শাসন ক্ষমতা দখল করেন। ১৭২১ (মতান্তরে ১৭২২) খ্রিস্টাব্দে বুদিকোটে এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ফতে মহম্মদ নানা স্থানে ভাড়াটিয়া সৈনিকের কাজ করে বেড়াতেন। নিরক্ষর হায়দার আলি ২৭ বছর বয়সে মহীশূরের প্রধান সেনাপতি নঞ্জরাজের অধীনে একজন সামান্য অশ্বারোহী সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। নিজ কর্মদক্ষতার গুণে অচিরেই তিনি তাঁর প্রভুর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন এবং তাঁর প্রভাব ও ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিন্দিগুলের ফৌজদার নিযুক্ত হন। এ সময় মহীশূরের হিন্দু রাজা চিক্কা কৃষ্ণরাজ ওড়িয়ার এবং রাজপরিবার কার্যত নজুরাজের হাতে বন্দী ছিল। নগুরাজ ও তাঁর ভ্রাতা দেবরাজ-ই রাজ্যের সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তাঁদের অযোগ্য শাসনে মহীশূরের সর্বত্র চরম বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে হায়দার আলি তাঁর প্রভু নঞ্জরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। (346) fa:) (“Hyder was one of the ablest personalities in the history of India, who rose from obscurity to power during the distractions of the eighteenth century.”- K. K. Datta, vide An Advanced History of India, P. 685 ) । ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেদনুর, গুটি, সুন্দা, সেরা প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে তিনি মহীশূর রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করেন। তাঁর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন, রায়তওয়ারী বন্দোবস্তের প্রবর্তন, জমি জরিপ ও শিল্প-বাণিজ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে মহীশূর একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত হয়।
ইংরেজদের সঙ্গে হায়দারের বিবাদের কারণ :
রাজত্বের সূচনা-পর্বে হায়দার আলির সঙ্গে ইংরেজদের রোধের কোন কারণ ঘটেনি এবং হায়দার আলি ইংরেজদের পছন্দই করতেন। কালক্রমে নানা কারণে হায়দার আলির সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। (১) প্রশাসন ও সেনাবিভাগে নানা সংস্কার প্রবর্তন করে হায়দার আলি মহীশূরকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেন। (২) ফরাসীদের সঙ্গে হায়দার আলির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ইংরেজদের মনঃপুত হয়নি। কর্ণাটকের তৃতীয় যুদ্ধের (১৭৫৬ খ্রিঃ) সময় হায়দার আি ফরাসী সেনাপতি কাউন্ট লালিকে অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে সাহায্য করলে ইংরেজরা প্রবল হয়। (৩) হায়দারের অন্যতম প্রধান শত্রু আর্কটের নবাব মহম্মদ আলি ছিলেন ইংরেজ-আশ্রিত। আর্কটের সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার মহম্মদ আলির জ্যেষ্ঠ জাতা মহাফজ খাঁ-কে হায়দার নিজ দরবারে আশ্রয় দেন। এছাড়া, মহান আলির প্রধান শত্রু চাদাসাহেবের পুত্র রাজাসাহেবকেও হায়দার আলি চাকরি দেন। এতে ইংরেজরা প্রবল ক্ষুব্ধ হয়। (৪) মহম্মদ আলির সঙ্গে হায়দারের বিবাদের কালে হায়দারের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে ইংরেজরা মহম্মদ আলির সমর্থনে ভেলোরে একদল সৈন্য মোতায়েন করে। এতে হায়দার ক্ষুব্ধ হন। (৫) হায়দার যখন নিজ রাজ্যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছিলেন, তখন ইংরেজরা তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। (৬) মহীশূরের ক্ষমতাচ্যুত ও নজরবন্দী রাজার সঙ্গে ইংরেজরা হায়দার-বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে হায়দার প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন।
(ক) প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৬৭-৬৯ খ্রিঃ) :
হায়দার আলির উত্থান দাক্ষিণাত্যের অপর তিন শক্তি- মারাঠা, নিজাম ও ইংরেজদের শিরঃপীড়ার কারণ হয়। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে এই তিন শক্তি হায়দার-বিরোধী এক মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করে। ঐতিহাসিক মাদ্রাজের সন্ধি ডডওয়েল বলেন যে, ইংরেজ, নিজাম ও মারাঠাদের এই জোট স্থায়ী হওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল না, কারণ তাদের স্বার্থ ছিল পরস্পর-বিরোধী। সুচতুর হায়দার আলি কুটকৌশল ও অর্থের বিনিময়ে মারাঠা ও নিজামকে ইংরেজ পক্ষ ত্যাগে বাধ্য করেন। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে হায়দার আলি ইংরেজদের আশ্রিত কর্ণাটকের নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ শুরু হয়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে হায়দারের সেনাবাহিনী অতর্কিতে ইংরেজ ঘাঁটি মাদ্রাজের উপকণ্ঠে হাজির হলে ভীত ইংরেজ, কর্তৃপক্ষ হায়দার আলি প্রদত্ত শর্তে মাদ্রাজের সন্ধি (১৭৬৯ খ্রিঃ) স্বাক্ষরে বাধ্য হন। সন্ধির শর্ত অনুসারে স্থির হয়। যে, (১) একে অন্যের অধিকৃত স্থানগুলি পরস্পরকে ফিরিয়ে দেবে এবং (২) এক পক্ষ অপর কোন তৃতীয় শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্য পক্ষ তাকে সাহায্য করবে। এইভাবে প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
(খ) দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০-৮৪ খ্রিঃ) :
১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের সন্ধির দ্বারা ইংরেজ ও মহীশূরের মধ্যে কোন স্থায়ী সম্ভাব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই সন্ধি ছিল কোম্পানীর পক্ষে যুদ্ধের কারণ তীব্র অপমানজনক। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠারা মহীশূর আক্রমণ করলে পূর্ব- শর্ত অনুসারে হায়দার ইংরেজদের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হন। এতে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্র ধরে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ভারতে ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজরা মহীশূর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ফরাসী উপনিবেশ মাহে দখল করে। হায়দারের প্রতিবাদেও কোন কাজ হয় না। তখন তিনি নিজাম ও মারাঠাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি ত্রিশক্তি জোট গঠন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি :
প্রথম ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে (১৭৭৫-৮২ খ্রিঃ) ইংরেজদের ব্যস্ততার সুযোগে হায়দার কর্ণাটকের ওপর আক্রমণ হানেন (১৭৮০ খ্রিঃ) এবং রাজধানী আর্কট দখল করে নেন। শুরু হয় দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ। ইংরেজপক্ষ সমূহ বিপদ উপলব্ধি করে মারাঠাদের সঙ্গে সলবই-এর সন্ধি (১৭৮২ খ্রিঃ) স্বাক্ষর করে বিবাদ মিটিয়ে নেয় এবং নিজামকেও দলে টানে। মিত্রহীন হায়দার একাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকেন। ইংরেজ সেনাপতি স্যার আয়ার কূটকে হায়দারের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। ত্রিনোমালি ও পোর্টোনোভা-র যুদ্ধে হায়দার পরাজিত হন। ফরাসী নৌ-সেনাপতি সায়েনের নেতৃত্বে একটি নৌবহর দাক্ষিণাত্যে পৌঁছলে হায়দারের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ইতিমধ্যে কর্কট রোগে হায়দারের মৃত্যু ঘটে ( ১৭৮২ খ্রিঃ) এবং ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইওরোপে ইঙ্গ-ফরাসী দ্বন্দ্বের অবসান হয়। হায়দারের সুযোগ্য পুত্র টিপু সুলতান বীর বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষ টিপুর সঙ্গে ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন। (১৭৮৪ খ্রিঃ)। সন্ধির শর্তানুসারে উভয়পক্ষ পরস্পরের অধিকৃত স্থানগুলি ফেরত দেয়। বলা বাহুল্য, এই সন্ধি একটি সাময়িক যুদ্ধ-বিরতি ছিল মাত্র। ওয়ারেন হেস্টিংস এই সন্ধিকে ‘অপমানজনক শাস্তি’ (humiliating pacification) বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক ড. মহিবুল হাসানের মতে এই সন্ধি টিপুর ‘কূটনৈতিক জয়’।
হায়দার আলির কৃতিত্ব :
অষ্টাদশ শতকের ভারত ইতিহাসে হায়দার আলি এক বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। একজন অতি সাধারণ সৈনিক হিসেবে জীবন শুরু করে কেবলমাত্র নিজ প্রতিভা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও হায়দার জালির অসমসাহসিকতার বলে তিনি মহীশূর রাজ্যের প্রধান শাসকে পরিণত হন এবং অষ্টাদশ শতকের ভারত ইতিহাসে স্থায়ী কীর্তির স্বাক্ষর রেখে যান। মারাঠা, নিজাম ও ইংরেজ—তিন শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিরামহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে যাওয়া কম কথা নয়। ব্যক্তিগত জীবনে নিরক্ষর হলেও তিনি নানা গুণের অধিকারী ছিলেন এবং শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন সফল। মহীশূর রাজ্যের কৃষিকার্যের উন্নতি, পতিত জমি পুনরুদ্ধার, বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি, সামরিক ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক উইলস্ (Wilkes) তাঁর ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রশংসা করেছেন। তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রীই ছিলেন ব্রাহ্মণ। ঐতিহাসিক স্মিথ তাঁর সম্পর্কে নানা কটূক্তি করলেও হায়দার আলি যে ভারত ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল স্থানের অধিকারী ছিলেন, সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই।

(গ) তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯০-৯২ খ্রিঃ) :
যুদ্ধের কারণ :
ম্যাঙ্গালোরের সন্ধি ছিল একটি ‘শূন্যগর্ভ’ চুক্তি (hollowed truce’) এবং এর দ্বারা দু’পক্ষের বিবাদের কোন অবসান হয়নি। এই সন্ধি একটি সাময়িক যুদ্ধ-বিরতি ছিল মাত্র। উভয় পক্ষই জানত যে, অচিরেই আবার যুদ্ধ শুরু হবে। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে টিপু ইংরেজদের শত্রু ফরাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন এবং কনস্টান্টিনোপল, কাবুল, মরিশাস প্রভৃতি স্থানে দূত পাঠান। অপরদিকে ইংরেজ পক্ষও নিশ্চেষ্ট ছিল না। বড়লাট কর্নওয়ালিস নিজামের সঙ্গে এক সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে কর্নওয়ালিস নিজামের কাছে ইংরেজদের মিত্র রাজ্যগুলির এক তালিকা দেন—তাতে মহীশূরের নাম ছিল না। স্বভাবতই টিপু রুষ্ট হন এবং ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংরেজদের মিত্ররাজ্য ত্রিবাংকুর আক্রমণ করলে তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ শুরু হয় ।
শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি :
নিজাম ও মারাঠারা ইংরেজ পক্ষে যোগদান করে। দু’বছর ধরে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের পর ত্রি-শক্তি জোটের কাছে টিপু পরাজিত হন। তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তম অধিকৃত হয় এবং তিনি শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি (১৭৯২ খ্রিঃ) স্বাক্ষরে বাধ্য হন। সন্ধির শর্ত অনুসারে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা এবংইংরেজ, নিজাম ও মারাঠাদের নিজ রাজ্যের অর্ধাংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। ক্ষতিপূরণের টাকার জমিন হিসেবে টিপু তাঁর দুই পুত্রকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেন। এর ফলে ‘মহীশুর শার্দুল’ টিপুর শক্তি প্রবলভাবে খর্ব হয় এবং তাঁর পতন সুনিশ্চিত হয়ে et (“The treaty of Seringapatam in reality paved the way for his final overthrow by Wellesley.” History of Tipu Sultan, M. Hassan, P. 264)।
(ঘ) চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯৯ খ্রিঃ) :
কারণ : টিপুর পক্ষে শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। মহীশূরের অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও সেনাবাহিনী সুসংহত করে তিনি নিজ শক্তি বৃদ্ধি করেন। সামরিক সাহায্য লাভের আশায় তিনি ফ্রান্স, মরিশাস, কনস্টান্টিনোপল, আরব, কাবুল প্রভৃতি বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজে ফ্রান্সের ‘জেকোবিন ক্লাব’ (Jacobin Club)-এর সদস্য হন এবং কিছু ফরাসী স্বেচ্ছাসেবক তাঁর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মহীশূরে উপস্থিত হয়। তাদের প্রেরণায় টিপু রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে স্বাধীনতার স্মারক-বৃক্ষ’ বা ‘Tree of Liberty’ রোপণ করেন। ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫ খ্রিঃ)-র পক্ষে টিপুর শক্তিবৃদ্ধি মেনে নেওয়া সম্ভব হল না। ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তার ও সুদৃঢ় করার জন্য তিনি অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রবর্তন করেন এবং ১৭১১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে টিপুর কাছে এক চরমপত্র পাঠিয়ে তাকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের নির্দেশ দেন। টিপু এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলে ইংরেজ ও নিজামের যুগ্মবাহিনী মহীশূর আক্রমণ করে (১৭৯৯ খ্রিঃ)। সদাশির ও মলভেরীর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে টিপু রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে আশ্রয় নেন। শত্রুপক্ষ রাজধানী অবরোধ করে এবং তিনি এই যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন (৪ঠা মে, ১৭৯৯ খ্রিঃ)। তাঁর মৃত্যুতে স্বাধীন মহীশূর রাজ্যের পতন ঘটে। টিপুর মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্যের বৃহদংশ ইংরেজ ও নিজামের মধ্যে বণ্টিত হয়। অপর অংশে মহীশূরের প্রাচীন হিন্দু রাজবংশের এক নাবালককে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এইভাবে দাক্ষিণাত্যে ইংরেজদের প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী মহীশূর রাজ্যের পতন ঘটে।
ফলাফল :
ঐতিহাসিক ডীন হাটন (Dean Hutton) বলেন যে, সামরিক, অর্থনৈতিক ও শান্তিকারী ব্যবস্থা হিসেবে মহীশূর জয় হল ক্লাইভের পরবর্তীকালে অর্জিত সৰ্বাধিক সাফল্য (“As a military, financial and pacificatory settlement, the conquest of Mysore was the most brilliant success of the British power since the days of Clive.”)। এই যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা এক প্রবল পরাক্রান্ত শত্রুর হাত থেকে অব্যাহতি পায়। ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের ক্ষেত্রে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা প্রথম বাধাটি অতিক্রম করেছিল, শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধে দ্বিতীয় বাধাটি অতিক্রান্ত হয়। এই যুদ্ধের ফলে ফরাসীরা তাদের শেষ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্রের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে ফরাসীদের বাধাদান প্রচেষ্টার স্থায়ী বিলুপ্তি ঘটে।
টিপুর কৃতিত্ব :
আধুনিক ভারতের ইতিহাসে টিপু সুলতান এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ( Tipu is in many respects, a remarkable personality in Indian history – K. K. Datta, vide An Advanced History of India, P. 714)। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তাকে “নিষ্ঠুর বর্বর’, ‘অসভ্য উম্মাদ’, ‘দুর্ধর্ষ ধর্মোন্মত্ত অশিক্ষিত মুসলমান’ প্রভৃতি আখ্যায় ভূষিত করলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সদাশয়, সাহসী, বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, পরিশ্রমী, ধর্মভীরু, জনপ্রিয় ও বিধান নরপতি। সমকালীন সকল কলুষতামুক্ত টিপু সুলতান ছিলেন ফরাসী বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতার নির্ভীক যোদ্ধা, প্রজাহিতৈষী ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। ফার্সী, ঊর্দু, কানাড়া প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষায় তার যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিল এবং তাঁর একটি বিল স্থাপ স্যার জন শোর শ্রমিক-কৃষকদের উন্নয়নের জন্য তাঁর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
মহীশূরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ
রাজনৈতিক : হায়দার আলি ও টিপু সুলতান মহীশূরে যে শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তা ছিল ব্যক্তিনির্ভর ও স্বৈরতান্ত্রিক। এই শাসনব্যবস্থায় হায়দার আলি ও তাঁর পুত্র টিপু সুলতানই ছিলেন সর্বেসর্বা। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসাধারণকে সন্তুষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে তারা কোন রাজকীয় উপাধি ধারণ করেননি। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য হায়দার আলি সরকারি কাজকর্মকে ১৮টি দপ্তরে ভাগ করে ১৮ জন ‘সচিব’-এর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই দপ্তরগুলির মধ্যে রাজস্ব দপ্তর ও বৈদেশিক বিভাগ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি সমগ্র রাজ্যকে ৯টি প্রদেশ বা আসরফি টুকরি -তে ভাগ করেন। প্রদেশের শাসনকর্তাকে বলা হত ‘আসর’। প্রদেশগুলিকে কয়েকটি জেলা বা ‘আমিলদারি টুকরি’-তে বিভক্ত করা হয়। জেলার প্রধানকে বলা হত আমিলদার’। ত্রিশটি গ্রাম নিয়ে জেলা গঠিত হত। গ্রামের শাসনকার্য পরিচালনা করত ‘প্যাটেল’। সেনাপতিকে বলা হত ‘ফৌজদার’। স্বৈরাচারী শাসক হলেও হায়দার আলি ও টিপু সুলতান যথার্থ প্রজাহিতৈষী শাসক ছিলেন। তাঁরা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তাঁরা উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করতেন এবং এসময় বহু হিন্দু দেবমন্দির নিষ্কর ভূমি ভোগ করত।
অর্থনৈতিক : রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতির ব্যাপারে উভয়েই সজাগ ছিলেন। (১) প্রজারা নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করে জমির স্বত্ব ভোগ করতে পারত। রাজস্বের পরিমাণ ছিল মোট উৎপাদনের ই বা ভাগ। এই সময় রাজ্যের বৃহৎ এলাকায় ‘পলিগার’ বা জায়গীরদারী প্রথা প্রচলিত ছিল। জায়গীরদাররা পুরুষানুক্রমে জমির ওপর দখলীস্বত্ব ভোগ করত। হায়দার ও টিপু উভয়েই জায়গীরদারদের যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন ও তাদের ক্ষমতা সংকুচিত করেন। আমিলদারদের ওপর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব অর্পিত হয় এবং তারা যাতে অন্যায়ভাবে প্রজাদের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায় করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি ছিল। কৃষির উন্নতির দিকে তাঁদের যথেষ্ট নজর ছিল। তাঁরা সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি ঋণদান ও প্রয়োজনে ভূমিরাজস্ব মকুবের ব্যবস্থাও করেন। অনাবাদী জমি পুনরুদ্ধারের ব্যাপারেও তাঁরা খুব আগ্রহী ছিলেন। (২) কেবল কৃষিই নয়- – ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে রাজ্যের আর্থিক পুনর্গঠনেও তারা সচেষ্ট ছিলেন। টিপু সুলতানের উদ্যোগে শ্রীরঙ্গপত্তম, চিতলদ্রগ, ব্যাঙ্গালোর, বেদনুর প্রভৃতি স্থানে ছুরি- কাঁচি, কাগজ, ঘড়ি, কামান, গাদাবন্দুক এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ও শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। রাজ্যে শিল্প-সম্প্রসারণের জন্য তিনি বিদেশ থেকে শিল্প-বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসতেন। (৩) হায়দার ও টিপু উভয়েই বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে প্রবল আগ্রহী ছিলেন। টিপুর উদ্যোগে গুরমুজ, জেড্ডা, এডেন, মাস্কট প্রভৃতি বন্দরে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন ও বাণিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ করা হয়। রপ্তানিকৃত পণ্যাদির মধ্যে ছিল চন্দনকাঠ, রেশম, সুগন্ধী মশলা, সরু চাল, লবঙ্গ, সুপারি, দারুচিনি, লঙ্কা প্রভৃতি। তিনি সোনা, তামাক, চন্দনা, হাতি প্রভৃতি কয়েকটি পণ্যের বাণিজ্য রাষ্ট্রায়ত্ত করেন। ব্যবসা- বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য তিনি একটি বাণিজ্য সংস্থা গঠন করেন। ড. এম এইচ খান মন্তব্য করেছেন যে, দেশী-বিদেশী শত্রুর দ্বারা উৎপীড়িত না হলে টিপু হয়তো মহীশূরে একটি শিল্প-বিপ্লবই ঘাটিতে ফেলতেন। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে টিপুর মৃত্যুর পর ইংরেজরা মহীশূরের কৃষকদের আর্থিক সমৃদ্ধি লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছিলেন।
মহীশূরের পতনের কারণ :
ঐতিহাসিক উইল্স্ মন্তব্য করেছেন যে, মহীশূর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য হায়দার এবং তা ধ্বংস করার জন্য টিপু জন্মগ্রহণ করেন (“Haider was born to create an empire, Tipu to lose one. “)। এ ধরনের মন্তব্যে কিছুটা সত্যতা থাকলেও তা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার (১৭৬৫-১৮৫৭ খ্রিঃ)। সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া যায় না। টিপু সুলতান বা মহীশূর রাজ্যের পতনের পশ্চাতে একাধিক কারণ বিদ্যমান ছিল। প্রথমত, দেশপ্রেমিক ও বীর যোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও পিতা হায়দার আলির বাস্তববাদী। দৃষ্টিভঙ্গি, কূটকৌশল ও বিচক্ষণতা পুত্র টিপু সুলতানের ছিল না। ইংরেজদের প্রতিরোধ করার জন্য দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য শক্তিগুলি থেকে ইংরেজদের বিচ্ছিন্ন করা অপরিহার্য ছিল। টিপু সুলতান এ ধরনের কূটনীতি প্রয়োগের কথা চিন্তা করেননি। দ্বিতীয়ত, টিপু সুলতান যুদ্ধ ও শাসনব্যবস্থার সব দিকে নিজেই নজর দিতেন। খুঁটিনাটি সব বিষয়ে নজর দিতে গিয়ে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি উপযুক্তভাবে নজর দিতে পারেননি। এর ফল রাষ্ট্রের পক্ষে মঙ্গলজনক হয়নি। তৃতীয়ত, ইংরেজরা টিপুর বিরুদ্ধে মারাঠা ও নিজামের সাহায্য পেয়েছিল। টিপু কিন্তু কোন দেশীয় শক্তির সাহায্য পাননি। তিনি নির্ভর করেছিলেন ফরাসী সাহায্যের ওপর, যা বস্তুত কোন উপকারেই আসেনি। চতুর্থ, টিপু রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমের নিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তার রাজত্বের শেষ দিকে তিনি রাজধানী অবরোধ হওয়া সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। এজন্য প্রয়োজনীয় সব মালপত্র তিনি রাজধানীতে গুদামজাত করেন। রাজধানীর নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে তিনি। রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রতি অবহেলা করেন। পঞ্চমত, ইংরেজদের বিরুদ্ধে হায়দার আলির সাফল্যের মূলে ছিল তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী। টিপু সুলতান অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা হ্রাস করে। পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। এর ফল ভাল হয়নি। টিপুর আমলে ইংরেজরা একটি সুদক্ষ অশ্বারোহী বাহিনী গড়ে তুলে তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে এবং অপরপক্ষে, টিপুর পদাতিক বাহিনীও বন্দুক ও কামানে সজ্জিত ইংরেজ পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠেনি। ষষ্ঠত, সামগ্রিকভাবে ব্রিটিশ বাহিনীর রণকৌশল ও সামরিক দক্ষতা মহীশূরের বাহিনী অপেক্ষা অনেক উন্নত ছিল। সপ্তমত, ভারতের বৃহত্তর অংশ জয় করে ইংরেজ সেনাদল তখন একরকম অপরাজেয় হয়ে ওঠে। এ রকম একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেশি দিন কারো পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। টিপুর ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক কিছু হয়নি। সর্বশেষে বলা যায় যে, টিপুর কর্মচারীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এইসব কারণে মহীশূর রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল।